শনিবার, ২০ Jun ২০২৬, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন

“ফাঁসি চাই”: বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে প্রবল জনসমর্থনের পেছনে কী আছে?

হোসাইন মোহাম্মদ সাগর

“ধর্ষকের ফাঁসি চাই”, “খাদ্যে ভেজাল দিলে ফাঁসি দিতে হবে”, “হত্যাকারীর একমাত্র সাজা ফাঁসি”—এমন প্ল্যাকার্ড হাতে দেশের রাজপথে বারবার দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে এই বছরের শুরুতে ক্যাম্পাসজুড়ে যখন তীব্র বিক্ষোভ দেখা যায়, তখন সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে ফাঁসির দাবিই। এমনকি সড়কে আঁকা হয়েছিল ফাঁসির দড়ির প্রতীকও।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই যেকোনো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হলেই জনতার মুখে ফিরে আসে এক স্লোগান—“ফাঁসি চাই”। শুধুমাত্র ধর্ষণ বা খুন নয়, খাদ্যে ভেজাল, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, এমনকি ধর্ম অবমাননার অভিযোগেও শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের দাবি উঠতে দেখা গেছে।

বিশ্বের বিপরীতে বাংলাদেশ:

বিশ্বের বহু দেশ যখন মৃত্যুদণ্ড পরিত্যাগ করেছে, বাংলাদেশ তখনও নিয়মিতভাবে এই সাজা দিচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, বিশ্বের ১০৬টি দেশ মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করেছে। আর ৮০টিরও বেশি দেশে এই সাজা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা হয় না। কিন্তু এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দিক থেকে অন্যতম শীর্ষে। ২০১৮ সালেই বাংলাদেশে প্রায় ২৩০ জনকে নতুন করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর আগের রায়সহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ছিল ১,৫০০-এর বেশি।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রতিশোধের মনোভাব:

নৃবিজ্ঞানী জোবায়দা নাসরিন মনে করেন, এই প্রবল জনসমর্থনের পেছনে রয়েছে **বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর অনাস্থা**। তার ভাষায়, “বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, আন্দোলন বা বড় ধরনের আওয়াজ না উঠলে বিচার প্রক্রিয়া খুব ধীর গতিতে চলে। সেটা গ্রেফতার থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা পর্যন্ত।”

এই ধীরগতি মানুষকে ‘আইনি প্রতিকারের’ চেয়ে ‘ত্বরিত প্রতিশোধ’-এর দিকে ঠেলে দেয়। ফলে জনগণ মনে করে, মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র উপযুক্ত ও কার্যকর শাস্তি, যা অপরাধীর জীবন থেকেই ‘বিচার’ নিয়ে নেয়।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও আবেগের স্থান:

বিচারপ্রার্থী জনগণ শুধু আইন নয়, আবেগের জায়গা থেকেও মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলে। ঢাকার এক বাসিন্দা বলছিলেন, “আমার পরিবারের কারও যদি এমন অপরাধের শিকার হয়, তাহলে আমি বলব—অপরাধীর পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই।” আরেকজন মনে করেন, “যদি মানুষ জানে এমন অপরাধে ফাঁসি হবে, তাহলে কেউ ভুল কাজ করার আগে দশবার ভাববে।”

শাহবাগ আন্দোলনের রূপক:

২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ছিল মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সবচেয়ে ব্যাপক ও সংগঠিত গণপ্রতিক্রিয়ার একটি নজির। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন লাখো মানুষ। শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ফাঁসির দাবির প্ল্যাকার্ড, কেউ কেউ সঙ্গে এনেছিলেন প্রতীকী ফাঁসির দড়িও। এই আন্দোলন বাংলাদেশে ‘ন্যায়বিচারের প্রতীক’ হিসেবে ফাঁসির দাবিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জায়গা করে দেয়।

মৃত্যুদণ্ডে কী সত্যিই অপরাধ কমে?

এই প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “কোনো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিলে অপরাধ কমবে কি না, সেটাই আমরা বিচার করে দেখি।” তার মতে, অপরাধের প্রকৃতি ও কার্যকারিতা বিবেচনায় সাজা নির্ধারণ জরুরি। শুধুমাত্র জনদাবি দেখেই শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত নয়।

শেষ কথা:

বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জনসমর্থন এসেছে আবেগ, প্রতিশোধ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি হতাশা থেকে। এটি একদিকে সমাজের ন্যায়বিচার চাওয়ার ইচ্ছার প্রতিফলন, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতারও একটি রূঢ় প্রতিচ্ছবি। বিশ্বের বহু দেশ যেখানে মানবাধিকার ও বিকল্প সাজা ব্যবস্থার পথে হাঁটছে, বাংলাদেশে এখনো “ফাঁসি”-ই অনেকের কাছে ন্যায়ের একমাত্র ভাষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com